একটু না হয় জিরিয়ে নিলাম-ইনামুল হাসান মাসুম


বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর মধ্যেও আছে নির্মল আনন্দ!

আমি বেড়াতে খুব পছন্দ করি। আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হচ্ছে, যখন আমি ঘুরতে বের হই। কাজ তো জীবনে থাকবেই, শত ব্যস্ততার মাঝে নিজেকে নতুন করে সতেজ করার জন্য এই ঘুরতে বের হওয়াটা টনিকের মতো কাজ করে। অনেকের চোখে আমার এই ঘুরে বেড়ানোটা অর্থের অপচয়মাত্র। কেউ কেউ ভাবে, যে পরিমাণ অর্থ আমার ঘুরে বেড়ানোর পেছনে খরচ হয়, তা দিয়ে হীরার নেকলেস কেনাটা অনেক বুদ্ধিমানের কাজ। অথচ আমার কাছে মনে হয়েছে, ঘুরে বেড়ানোর মধ্য দিয়ে আমি নতুন করে প্রাণশক্তি পেয়েছি, সঞ্চয় করেছি অনেক অভিজ্ঞতা, যা দামি একখণ্ড হীরার বিনিময়ে সম্ভব নয়। বেড়ালে মনের সংকীর্ণতা দূর হয়, খুলে যায় এক এক করে চোখের সামনে বন্ধ হয়ে যাওয়া সব জানালা। তাই আরও বেশি কাজ করার জন্য কাজের ফাঁকে এমন কিছু করতে হবে, যা নিজেকে আনন্দ দেয়, মনকে সতেজ রাখে।

আমাদের জগৎ সংসারে বহু ধরনের মানুষ আছে, যারা কিসের পেছনে দৌড়াচ্ছে নিজেরাই জানে না। এত প্রতিযোগিতার জীবনে কারোরই এতটুকু সময় নেই নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করা যে আমি কী চাই, আমি কি সুখী? আমি কি এটাই চেয়েছি জীবনের কাছে? মানুষ ক্রমশ ব্যস্ত হয়ে পড়েছে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমে। কার কত ব্যাংক ব্যালেন্স আছে, কে কত দামের গাড়ি হাঁকিয়ে বেড়ায়, কার ছেলেমেয়ে কোন স্কুলে পড়ে, কার রেজাল্ট কত ভালো, কেন সে অন্যের মতো হতে পারছে না, আরও কত কী। আমরা একটু সুখ খুঁজে ফিরি না সুস্থ প্রতিযোগিতার মাঝে। মানুষ এখন কাজ করতে করতে যন্ত্রের মতো হয়ে যাচ্ছে। তার ভেতরে আবেগ, ভালোবাসা যেন ফুরিয়ে গেছে। আমরা সারা দিন শুধু কাজ করছি সেই সকাল থেকে মধ্যরাত অব্দি। অফিস, মিটিং, সেমিনার, অর্থ, খ্যাতি, ক্ষমতা। এত ব্যস্ত জীবনে সময় কোথায় সংসারের কথা ভাবার? ভুলে যাচ্ছি ঘরে কেউ তার অপেক্ষায় বসে আছে। এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে সবাই যে মা, বাবা, স্বামী, স্ত্রী, ছেলেমেয়ে একসঙ্গে বসে খাবারের সময়টুকু এখন আর আমাদের হাতে নেই। সুখী খুব অল্পতেই হওয়া যায়। শত ব্যস্ততার মাঝে হঠাৎ করে ঘরে ফিরে দুজনে একসঙ্গে বারান্দায় বসে এক কাপ চা খাওয়ার মধ্যেও কত আনন্দ আছে, কত সুখ আছে কজনে বোঝে এখন? আর এই সুখ কি শুধু অন্যকেই সুখী করে? নিজেকে আনন্দ দেয় না? ঘরের আনন্দ ফেলে কেউ ছুটছে কৃত্রিম আনন্দের পেছনে, যে আনন্দ একটা সময় মানুষকে অমানুষ করে তুলছে।

জীবন চলে যাচ্ছে হু হু করে। পেছনে ফিরে তাকালে দেখতে পাই কত সময় চলে গেছে নীরবে, জানতেও পারিনি কাছের মানুষ গুলো কত অবহেলায় রাত পার করেছে শত যন্ত্রণায়। কেউ একবারও জানতে চায়নি, এই যে এত ব্যস্ততা, তার বিনিময়ে পরিবারের প্রিয় মানুষগুলো কী পেল। আমরা ছুটছি গন্তব্যহীনভাবে। জানি না কোথায় যাব। এত যে ব্যস্ততা, এত যে ছোটাছুটি, কিন্তু পেরেছি কি জীবনের অর্থ বের করতে? পেরেছি কি সুখী হতে? এত ব্যস্ততা কি জীবনে ছোট ছোট আনন্দ, ছোট ছোট সুখ, ছোট ছোট ভালোবাসা কেড়ে নেয়নি আমাদের জীবন থেকে! শত ব্যস্ততার মধ্যেও নিজেকে উজ্জীবিত করার জন্য, সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্কটাকে মজবুত করার জন্য, ছেলেমেয়ের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ার জন্য সময় বের করে নিয়ে বেড়াতে যাওয়াটা খুবই প্রয়োজন। তাতে নতুন করে একে অপরকে বুঝতে পারে, মনের না বলা কত কথা ভাগাভাগি করতে পারে। শুধু পরিকল্পনা করে বেড়াতে গেলেই নিজেকে সতেজ করা যায় তা নয়, মোটকথা, ব্যস্ত জীবনে একটু দম নিন। বিশ্রাম নিন। আনন্দ করুন।

কাজ করছেন এগিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু জীবনের অর্থ বের করতে পেরেছেন তো? নয়তো মরীচিকার পেছনে ছুটতে ছুটতে একদিন ক্লান্ত হয়ে পেছনে ফিরে যদি দেখি, যা কিছু করেছি সবকিছুই আজ অর্থহীন মনে হচ্ছে, সেখানে প্রেম নেই, ভালোবাসা নেই, নেই কোনো চাওয়া-পাওয়া, তাহলে এই জীবনের অর্থ কী? আমার চাই, আমাদের চাই ছোট একটু নিরাপদ আশ্রয়, এক জোড়া হাত, শত ব্যস্ততার মধ্যেও প্রাণভরে নিশ্বাস নেওয়ার জন্য একজন বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে ছুটে চলা, জীবনকে সুন্দরভাবে উপলব্ধি করার জন্য কোলাহল ছেড়ে দূরে কোথাও হারিয়ে যাওয়া। ব্যস্ততা যেন কেড়ে না নেয় আমাদের পরিবারের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বসে পড়াশোনা করার আনন্দ, ব্যস্ততা যেন কেড়ে না নেয় বৃষ্টির দিনে ভুনা খিচুড়ির স্বাদ, ব্যস্ততা যেন কেড়ে না নেয় একে অন্যের প্রতি ভালোবাসাকে, তাহলে এই জীবন হবে শুধুই অলেখা সাদা পৃষ্ঠার মতো। যেখানে থাকবে না কোনো রং, কোনো বর্ণ, কোনো গল্পের চরিত্র; সবটুকুই হবে বড় অর্থহীন। সবচেয়ে বড় কথা, ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত হয়ে নিজের কাজেই যদি চলে আসে অনীহা, যদি থেমে যায় গতি, তবে ক্ষতিটা কার?

বিদেশে মানুষ ছুটির দিনটাকে উপভোগ করে ছুটির দিনের মতোই। আমি জানতে পেরেছি এবং দেখেছি, ছুটি পেলেই তারা কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে যায় সঞ্চিত যেটুকু অর্থ আছে তাই নিয়ে। ছুটি ভোগ করে ফিরে এসে নতুন উদ্যমে আবার কাজে নেমে পড়ে। অথচ আমাদের দেশে ছুটি মানে ঘরে বসে থাকা, নারীরা ছুটিতে ঘরদোর পরিষ্কার করেন, বাচ্চাদের ছুটি মানে নতুন ক্লাসের বই তাকে ধরিয়ে দেওয়া, যাতে নতুন ক্লাসে উঠে অন্যদের চাইতে সে ভালো নম্বর পায় তা দেখে আত্মতৃপ্তি পাওয়া। এটাও মায়েদের মধ্যে সন্তানদের নিয়ে এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা। আমরা এই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমে সন্তানদের শৈশবটাকে গলা টিপে মেরে ফেলছি। ছোট থেকেই তাকে শেখাচ্ছি কী করে ছুটতে হয়। খেলা ভুলে যে শিশু আজ নম্বরের পেছনে ছুটবে, কাল সে-ই তো ছুটবে আনন্দ ভুলে কাজের পেছনে। আমরা যে তা-ই চাই! সমাজে অনেক প্রতিষ্ঠিত মানুষ আছেন, যাঁরা ভুলে গেছেন তাঁর নিজের জন্য কিছু সময়ের প্রয়োজন, নিজের ভালো লাগার জন্য, চাওয়া-পাওয়ার জন্য। আমি জীবনকে এভাবেই রাঙাতে চাই জীবনের সুরে, জীবনের ঘুম এভাবেই ভাঙাতে চাই—

‘চল হে জীবন রঙের তুলিতে

তোমাকে কেবলি রাঙাই

ভৈরবী সুরে, হাসির ছোঁয়ায়

তোমার সে ঘুম ভাঙাই’

আমাদের জীবনটা খুব ছোট। আমরা নিজেরাও জানি না আসলে আমরা কিসের পেছনে ছুটছি। আমরা কী চাই, কিসে আমাদের আনন্দ, কিসে আমাদের দুঃখ। কখনো কখনো দুঃখবিলাসী হয়ে ওঠে আমাদের জীবন। সেই থেকে হতাশা। তাই কাজ তো করতেই হবে, কাজের পাশাপাশি একটু জিরিয়ে নিয়ে, নিজেকে সময় দিয়ে আবার না হয় কাজ করুন!


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *