ফরিদপুরে করোনা উপসর্গে মৃত্যু – স্ত্রী-সন্তান আত্মগোপনে; লাশ দাহ করলেন উপজেলা প্রশাসন


মোঃ ইনামুল হাসান মাসুম:
করোনা উপসর্গে মৃত্যু, স্ত্রী-সন্তান আত্মগোপনে; লাশ দাহ করালেন ফরিদপুর সদর উপজেলার ইউএনও মোঃ মাসুম রেজার দিকনির্দেশনায় সদর উপজেলা প্রশাসন টিম। করোনা উপসর্গে ফরিদপুর শহরের লালের মোড় এলাকার বাসিন্দা দেব দুলাল (দেবু) পোদ্দারের (৪৯) মৃত্যু হয়েছে। সোমবার ভোর ৬টায় ফরিদপুর ডায়াবেটিকস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। যদিও তার পাশে ছিলেন না পরিবারের সদস্যরা। হাসপাতালের মধ্যে তার মৃতদেহ রেখে আত্মগোপনে যান স্ত্রী ও সন্তানসহ আত্মীয়-স্বজনেরা।

এ পরিস্থিতিতে খবর পেয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ মাসুম রেজা নিজ দায়িত্বে উপজেলা প্রশাসনের একটি টিম এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তরুছায়া ফাউন্ডেশন ও উই কেয়ার সংগঠনের নেতৃবৃন্দকে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন। এরপরে স্বেচ্ছাসেবী টিম হাসপাতাল থেকে লাশ বের করেন, চিতায় উঠান এবং সৎকারের ব্যবস্থা করেন। বিষয়টি এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে বলে জানা গিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, কোথায় গেল হিন্দু সম্প্রদায়ের পারিবারিক বন্ধন।

উপজেলা প্রশাসন ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, করোনায় মৃত দেব দুলাল পোদ্দার (দেবু) একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। কর্মস্থল থেকে কাশিসহ করোনাভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে তিন’দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হন। এরপর আলাদা রাখা হয় দেব দুলাল (দেবু) পোদ্দারকে। সোমবার ভোরে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। জানা গিয়েছে, সোমবার সকালে বাড়ির লোকজন তার মৃত্যুর বিষয়টি টের পেলে কেউ কাছে যায়নি।

এ ব্যাপারে ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিক এনামুল হাসান জানান, উপজেলা প্রশাসন টিম ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ সহ সোমবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে দেব দুলাল (দেবু) পোদ্দারের লাশের নিকট পৌঁছান তিনি। এ সময় সামাজিক সংগঠন উই কেয়ার এবং তরুছায়া সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তারা জানতে পারেন দেবু পোদ্দার এর নিথর দেহটি হাসপাতালের মধ্যেই পড়ে আছে ঘন্টার পর ঘন্টা। পরিবারের লোকজন কেউ কাছে যাচ্ছেন না। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার স্ত্রী ও সন্তানের দেখা পাননি তারা। এক পর্যায়ে সদর উপজেলা প্রশাসনের একটি টিম হাসপাতালে মৃত ব্যক্তির রুমে প্রবেশ করেন। সঙ্গে ছিলেন শুধু কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী নেতৃবৃন্দ ও দৈনিক সুবহে সাদিকের একজন সাংবাদিক।

এ সময় মৃত ব্যক্তির শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এরপর কাঁধে করে দেব দুলাল পোদ্দার (দেবু) এর মরদেহ হাসপাতাল থেকে বের করেন উপজেলা প্রশাসনের টিম, উই কেয়ার সংগঠনের সমন্বয়ক সন্জয় সাহা ওই সাংবাদিক। এ কাজে সহযোগিতা করেন মৃত দেবু পোদ্দার এর দুরসম্পর্কের এক নাতি ও সৎকারের জন্য ইউএনওর উদ্যোগে আসা পরিতোষ সরকার। সরকারি এ্যাম্বুলেন্স যোগে পৌরসভার অম্বিকাপুর শ্মশানে আনার পর মৃত ব্যক্তিকে চিতায়ও তোলেন উপজেলা প্রশাসনের টিম।

সাংবাদিক বলেন, আত্মগোপনে থাকার অনেক পরে মৃত দেবু পোদ্দার এর ভাতিজা সাম্য পোদ্দার (১৮) এগিয়ে আসেন। দাহ কাজে পারিবারিক ভাবে খড়ি সহ অন্য অন্য সব কিছুর ব্যবস্থা করেন সাম্য পোদ্দারের স্বজনরা। তার বাবাকে দাহ করার সময় ছেলেটি উপস্থিত থাকলেও তেমন কোনো আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশিরা ছিলেন না। ছেলেটি তার বাবার মুখেগ্নী দিয়ে দাহ কাজ শুরু করা হয়। দেব দুলাল দেবু পোদ্দারের মৃত কালে স্ত্রী ও শিশু দুই সন্তান রেখে যায়। সোমবার দুপুরে ফরিদপুর পৌরসভার অম্বিকাপুর শ্মশানে মৃত দেবু পোদ্দারকে দাহ করা হয়।

বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ মাসুম রেজা জানান, পরিবারের কেউ এগিয়ে না আসায় নিজ দায়িত্বে উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে মৃত দেবু পোদ্দার এর সৎকারের ব্যবস্থা করেছি। এ কাজে তাকে সহযোগিতা করেন একজন সাংবাদিক সহ তিনজন স্বেচ্ছাসেবী। তিনি আরো বলেন, এ পর্যন্ত ফরিদপুর সদর উপজেলায় ১০জন সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের কোভিড-১৯ পজিটিভ ও উপসর্গ নিয়ে মারা গিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৮জনকে সৎকারের ব্যবস্থা হয়েছে ইউএনও মোঃ মাসুম রেজার সার্বিক সহযোগিতা ও নির্দেশনায়। তাহার গঠন করা ফরিদপুর সদর উপজেলা প্রশাসন টিম এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন উই কেয়ার ও তরুছায়া ফাউন্ডেশনের নেতৃবৃন্দ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছে।