ফরিদপুরে স্বপ্ননীড়ের বরাদ্দ পেয়ে গৃহহীনদের প্রার্থনা


স্টাফ রিপোর্টার:
‘শেখ সাব আমাগো দ্যাশটা স্বাধীন করছে। গোলাগুলির (স্বাধীনের) পরে শেখ সাব দ্যাশের জন্নি কাজ শুরু করছিলেন; কিন্তুক আমরা শেখ সাবরে বাচাব্যের পারি নাই। ম্যালাদিন শেখের বেটি দ্যাশে আসতে পারে নাই। এখন আল্লায় তারে সরকার বানানোর জন্নি ক্ষমতা দিছে। শেখের বেটি আমাগো জন্নি ঘর বানাই দিতেছে। শেখের বেটিরে আল্লায় বাঁচায়ে রাহুক।’ এভাবেই খোদার দরবারে মনের আকুতি জানাচ্ছিলেন ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙ্গা উপজেলার বুরাইচ ইউনিয়নের জয়দেবপুরের বয়োবৃদ্ধ আলতাফ ফকির। আলতাফ ফকিরের বয়স এখন ৮৫ বছর ছুইছুই। ৪ ছেলে ১ মেয়ের জনক সে। মেয়েটার বিয়ে হয়েছে। শ্বশুড় বাড়িতে থাকে। ছেলেরা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল। কামলা দিয়ে দিনাতিপাত করে। তারা কোন রকম ছাপরা দিয়ে ছেলে সন্তান নিয়ে থাকে। আলতাফ ফকিরের থাকার ঘরটি বেশ আগেই ভেঙ্গে গেছে। এক ছেলের ছাপরার সামনে একটু খুপরি বানিয়ে থাকেতেন। সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুজিববর্ষ উপলক্ষে দেশের গৃহ ও জমিহীন এক লক্ষ পরিবারের জন্য জমিসহ ঘর নির্মান করে দিচ্ছেন। সেই তালিকায় আলতাফ শেখেরও একটি ঘর আছে। শীতের দিন। খুব ভোরে উঠতে পারেন না। একটু বেলা বাড়লে প্রতিদিনই আলতাফ ফকির আসেন ঘর দেখতে। ঘর দেখে আর আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। বিরবির করে কিছু বলেন। নিঃশব্দে কান পাতলে তার কথা বোঝা যায়।

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি, স্বাধীনতার মহানায়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ফরিদপুর অঞ্চলের মানুষ ‘শেখ সাব’ (সাহেব) নামেই ডেকে থাকেন। তার কন্যা বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বলেন ‘শেখের বেটি’। জয়দেবপুরে ঘর নির্মান কাজ দেখলে গেলে আলতাফ ফকিরের সাথে প্রতিবেদকের কথা হয়। ওখানেই কথা হয় একই এলাকার ভ্যান চালক আজিজুল খন্দকারের সহধর্মীনি সেহাগীর সাথে। নিজেদের কোন ঘর নাই, জমিও নাই। দুটি ছেলে মেয়ে নিয়ে থাকেন মামা শ্বুশুড় আমিনদ্দিনের বাড়িতে। আলফাডাঙ্গায় উপজেলায় ২২০ টি ঘরের মধ্যে তার জন্যেও একটি ঘরের বরাদ্দ রয়েছে। সে প্রতিদিন সকালেই আসেন ঘরটি দেখতে। শুধু ঘর দেখাই নয়, মিস্ত্রিরা ঠিক মত কাজ কছে কিনা তাও দেখেন। বললেন, ‘প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই, তিনি আমাদের কথা মনে রাখছেন। সোহাগী আরো বলেন, ‘এই ঘর ছাড়াও আগেও ঘর বানানো হইছে। সেখানেও অনেক লোক ঘর পাইছে। এবার আমরা পাইলাম। আল্লায় তারে মানুষের জন্য কাজ করার আরো শক্তি দিক। আমরা চাই, ম্যালা দিন বেইচ্যে থাহুক।’

আলফাডাঙ্গার বুরাইচের জয়দেবপুরের আলতাফ ফকির, সোহাগী ই নয়, বোয়ালমারীর স্বামীহীন সাবিরন নেছা (৭০), সালথা ঝুনাখালি গট্টির চান খা (৭২), শুকুর খা (৬৭), নগরকান্দা কোদালিয়া শহীদ নগরের মোজাম শেখ (৬৪), ভাঙ্গা আজিমনগরের নওসের, সদরপুরের হাওলাদার ডাঙ্গীর জাফর বিশ্বাস, চরভদ্রাসনের শীলডাঙ্গীর মালিহা বেগম (৫৫), ফরিদপুর সদরের আবুল মিয়া (৬২) সহ অসংখ্য ব্যক্তির সাথে কথা হয় প্রতিবেদকের। তারা সমস্বরে মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর মুজিববর্ষে গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য গৃহিত প্রকল্পের উপকারীতার কথা বলেন। সকলে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

এদিকে ঘর নির্মানে সার্বক্ষনিক নির্দেশনা দিচ্ছেন ফরিদপুরের জননন্দিত-কর্মঠ জেলা প্রশাসক অতুল সরকার। তার নির্দেশনায় তদারকি করছেন ফরিদপুরের উপজেলাসমূহের নির্বাহী অফিসারগণ। পিছিয়ে নেই সহকারী কমিশনার (ভূমি)গণও। সকাল থকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে তাদের কর্মকান্ড। সকালে নির্মানস্থলে ইউএনও আসছেন তো, দুপুরে আসছেন সহকারী কমিশনার (ভূমি), আবার সন্ধ্যায় দেখা যাচ্ছে ইউএনওকে। আবার বন্ধের দিনে ইউএনও, এসিল্যান্ড সারাদিনই অবস্থান করছেন নির্মান তদারকিতে। কখনো কখনো নিজে হাতে মিস্ত্রিদের কাজ দেখিয়ে দিচ্ছেন।

গৃহ নির্মাণের এই কাজে সমানতালে এগিয়ে এসেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিভাগের কর্মচারীরা। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত এমনকি মধ্যরাত পর্যন্ত চলছে এই নির্মাণ কাজ, কারণ জানুয়ারির ১৫ তারিখের মধ্যেই এই কাজ সম্পন্ন করার জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সমাজের অন্যান্যের সাথে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে এগিয়ে এসেছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত ফরিদপুরের সাংবাদিকগণও।

শুক্রবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২০ খ্রিস্টাব্দ। তখনো সূর্যের আলো ঠিকমত উঠে নাই, ঘন কুয়াশায় চারিদিক ঘেরা। সংবাদ কর্মীদের একটি টিম ছুটে চলেছে জেলার সালথা উপজেলার দিকে। ঘড়ির কাটা তখনো সাড়ে ৬ টা পার করেনি। উপজেলার গট্টি ইউনিয়নৈর ঝুনাখালি গ্রামে দেখা গেল উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিরা মনিকে। গৃহনির্মান পরির্দশন করছেন। জানালেন, দাপ্তরিক অন্যান্য কাজে যাতে ব্যাঘাত না ঘটে সেজন্য অতি প্রত্যুষে তিনি সরেজমিনে তদারকি করছেন গৃহ নির্মাণ কাজের অগ্রগতি। কিছু সময় পার না হতেই দেখা গেল নির্মান কাজের বালির ট্রাকের পেছনে পেছনে আসছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ হাসিব সরকার।

বেলা সাড়ে ৮ টা নাগাদ বোয়ালমারী উপজেলার গুনবহা ইউনিয়নের ফেলানগরে দেখা বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ঝোটন চন্দ্র। বললেন, দ্রুত কাজ শেষ করতে হবে। তাই ছুটে আসা। তাছাড়া শীতও পড়েছে। যাদের ঘর দেব তাদের যত আগে দিতে পারবো, ততই তাদের সুবিধে হবে। ১১ টা নাগাদ সংবাদকর্মীদৈর গাড়ি পৌছল আলফাডাঙ্গা উপজেলার বুরাইচ ইউনিয়নের জয়দেবপুরে। সেখানে উপজেলা চেয়ারম্যান একেএম জাহিদ হাসান, নির্বাহী অফিসার-তৌহিদ এলাহীকে একসাথে কাজ তদারকি করতে দেখা যায়। বন্ধের দিনেও ঘর নির্মানে তদারকির বিষয়ে জানতে চাইলে চেয়ারম্যান ও ইউএনও জানালেন, মুজিববর্ষে মাননীয় প্রধানন্ত্রীর একটি বিশেষ প্রকল্প এটি। গৃহহীন আর জমিহীনদের জন্য নির্মান করা হচ্ছে। বন্ধের দিনে নির্মান কাজে বেশি সময় দেওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়। আর বর্তমান জনবান্ধব সরকারের সময় আমাদের বন্ধের দিন বলতে কোন দিন নাই। সব দিনই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া দ্রুত নির্মান কাজ শেষ করতে পারলে মানুষের উপকার হবে।

এভাবে নগরকান্দা, ভাঙ্গা, সদরপুর, মধুখালী ও ফরিদপুর সদর উপজেলাসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে এই কার্যক্রম। রাত প্রায় নয়টা; চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী অফিসার জেসমিন সুলতানাকে পাওয়া গেল গৃহ নির্মাণ কাজের তদারকিতে। জানালেন, বিভিন্ন সময়ে সুবিধামতো তিনিসহ তার সহকর্মীরা এই কাজ মনিটরিং করছেন। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকগণ এবং জেলা প্রশাসক নিজেও এই কাজ নিয়মিত দেখতে আসছেন । যে কোন ভাবেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই কাজ শেষ করে উপকারভোগীদের নিকট তা বুঝিয়ে দিতে হবে।
শনিবার ১৯ ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ; বেলা ১১ টা। জেলার সদরপুর উপজেলার ভাসানচর ইউনিয়নের হালাদার ডাঙ্গীতে দেখা গেল জেলা প্রশাসক অতুল সরকারকে। তিনি সকল অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে নিয়ে ঘন নির্মান তদারকি করছেন। বললেন, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি। মূলতঃ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নানা নিরাপত্তা দেওয়ার লক্ষ্যেই গ্রহণ করা হয়েছে এ প্রকল্প। দরিদ্র, অসহায় ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য কাজ করছে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। তিনি আরো বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী জেলায় দ্রুত গৃহনির্মান কাজ চলছে। গৃহহীন ও ভূমিহীনদের অনতিবিলম্বে গৃহ ও ভূমি হস্তান্তরের জন্য কার্যক্রম চলছে বলে তিনি জানান।

ফরিদপুর জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনায় সারাদেশের ন্যায় ফরিদপুরেও ভূমিহীন ও গৃহহীনদের পূনর্বাসনের জন্য নির্মিত হচ্ছে ১৪৭০টি বসতঘর। জেলাব্যাপী শুরু হয়েছে এক মহা কর্মযজ্ঞ। জেলা প্রশাসক অতুল সরকারের নেতৃত্বে নয়টি উপজেলার ইউএনও ও এসি (ল্যান্ড)দের নিবিড় তদারকিতে গড়ে উঠছে আশ্রয়হীন মানুষের স্বপ্নের ঠিকানা ‘স্বপ্ননীড়’।
‘আশ্রয়নের অধিকার, শেখ হাসিনার উপহার’ স্লোগানে সাড়া দিয়ে জেলার প্রতিটি ভূমিহীন ও ঘরহীন পরিবারের জন্য থাকছে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্বলিত এ ঘর। প্রতিটি পরিবারের জন্য দুই কক্ষ বিশিষ্ট সেমি পাকা ঘর নির্মান কাজ চলছে। ফরিদপুর সদর উপজেলায় ২৯২ টি ঘর, আলফাডাঙ্গা উপজেলায় ২২০ টি ঘর, বোয়ালমারী উপজেলায় ৯২ টি ঘর, মধুখালী উপজেলায় ১৪৮ টি ঘর, নগরকান্দা উপজেলায় ১০৫ টি ঘর, সালথা উপজেলায় ৩৫ টি ঘর, ভাঙ্গা উপজেলায় ২৫০ টি ঘর, সদরপুর উপজেলায় ১৭৮ টি ঘর, চরভদ্রাসন উপজেলায় ১৫০ টি ঘর নির্মান করা হচ্ছে। প্রতিটি ঘর একটি করে পরিবারকে প্রদান করা হবে। শুধু ঘর নয়, ঘরের সাথে সাথে প্রতি পরিবারকে দেয়া হচ্ছে ২ শতাংশ করে জমি।

সরকারের এরকম কঠোর নির্দেশনা থাকায় ফরিদপুরের মাঠ প্রশাসনের কর্মচারীরা দিনরাত এক করে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। এ যেন আরেক মুক্তিযুদ্ধ। মুজিববর্ষে সকল ভূমিহীন ও গৃহহীনদের গৃহ নির্মাণ করে তাদেরকে পুনর্বাসন করার যুদ্ধ।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *