বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব-ইনামুল হাসান মাসুম


“Reading is to the mind what exercise is to the bode”

–Joseph Addison

এই কথাটি বলে গিয়েছেন ৩০০ বছর পূর্বে। আর বর্তমান মডার্ন সায়েন্স গবেষণার দ্বারা এই কথাটির সত্যতা প্রমাণ করেছে। ব্যায়াম যেমন আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখে তেমনি বই পড়ার মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের মনকে সুস্থ ও আনন্দিত রাখতে পারি। একটি ভালো বই মানুষের মনশ্চক্ষু যেমন খুলে দেয় তেমনি জ্ঞান ও বুদ্ধিকে প্রসারিত ও বিকশিত করে মনের ভিতরে আলো জ্বালাতে সাহায্য করে।

বই-ই হচ্ছে মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। যার সাথে পার্থিব কোনো সম্পদের তুলনা হতে পারে না। একদিন হয়তো পার্থিব সব সম্পদ বিনষ্ট হয়ে যাবে, কিন্তু একটি ভালো বই থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান কখনও নিঃশেষ হবে না, তা চিরকাল হৃদয়ে জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখবে।

আমাদের মধ্যে হয়তো অনেকেরই জানা আছে, আজ যারা সফলতার চরম শীর্ষে পৌঁছেছে তাঁরা সকলেই কতটা বই পড়তে আগ্রহী। জীবনে চরম সফল হওয়া সত্ত্বেও তারা বই পড়া থেকে নিজেদের বঞ্চিত রাখে না। বই পড়ার মধ্য দিয়ে তারা রোজ নিজেকে সমৃদ্ধ করে তোলেন। Warren Buffett তাঁর পেশা জীবনের শুরুতেই প্রতিদিন ৬০০-১০০০ পৃষ্ঠা নিয়মিত পড়তেন। তিনি বলেন –

”Read 500 pages like this everyday. That’s how knowledge works. It builds up, like compound interest. All of you can do it, but I guarantee not many of you will.“

Bill Gates প্রতিবছর ৫০টি বই শেষ করেন। Mark Cuban প্রতিদিন ৩ ঘন্টার বেশি বই পড়েন। Elon musk রকেট সায়েন্সের বিদ্যা বই পড়ার মাধ্যমে অর্জন করেছেন।

একটা বই শুধু তথ্য দেয় না, প্রশ্ন দেয় এবং নতুন করে চিন্তা করতে শেখায়। বই কেন পড়ব? বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা ঠিক কী? শারীরিক ও মানসিক ভাবে সুস্থ থাকতে বই আমাদের কতটা সাহায্য করে এসো জেনে নেওয়া যাক —

Health benifits of reading book
১) জ্ঞান বৃদ্ধি করে:- বই পড়ার মাধ্যমে আমাদের জ্ঞানের পরিধি ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি লাভ করে। যত বেশি বই পড়া যাবে, তত বেশি জ্ঞান বৃদ্ধি পাবে। বইয়ের ভেতরে থাকে অজানা তথ্যের খাজানা। যখন আমরা বই পড়বো তখন বইটির ভিতরে থাকা নানা ধরনের তথ্যের সাথে পরিচিতি লাভ করতে পারব। হোক সেটি ফিকশন কিংবা ননফিকশন, বই-ই পারে একজন মানুুষকে যথার্থ জ্ঞানী বানাতে। আর জ্ঞান সবসময় একজন মানুষকে সমৃদ্ধ করে।

২) মানসিক উদ্দীপনা তৈরি করে:- একটি গবেষণায় দেখা গেছে বই পড়ার অভ্যাস মানুষকে ”Dementia এবং Alzheimer’s” নামে দুটি রোগ প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। বই পড়ার ফলে মানুষের মস্তিষ্কে যে উদ্দীপনা ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয় তা মানুষের মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। মানুষের শরীরের অন্যান্য অঙ্গের মতো মস্তিষ্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। শরীর সুস্থ রাখতে আমরা যেমন ব্যায়াম করি তেমনি মস্তিষ্ককে সবল ও কর্মচঞ্চল রাখতে বই পড়া বিশেষ জরুরী।

৩) মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে:- ২০০৯ সালে United kingdom এর Sussex ইউনিভার্সিটির বৈজ্ঞানিকরা হার্ট রেট ও মাসেল টেনশন মনিটরিংয়ের মাধ্যমে পরীক্ষা করে দেখেন যে, কিছু কিছু কাজ আমাদের মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। তারা লক্ষ্য করেন যে মাত্র ছয় মিনিটের জন্য বই পড়লে স্ট্রেস লেভেল ৬৮% পর্যন্ত কমে যায়, যা হাঁটা (৪২%), কফি পান (৫৪%) বা গান শোনার (৬১%) থেকে অনেকটা বেশি কার্যকর। বই পড়ার মধ্যে পুরোপুরি ডুবে যাওয়ার ফলে যে বিষয়গুলি আমাদের অমনোযোগী করে বা স্ট্রেস লেভেল বাড়িয়ে দেয় তা অনেকটাই কমে যায়। কারন বই পড়ার মধ্য দিয়ে আমরা এক মূহুর্তে কোনো এক অজানা জগতে পৌঁছাতে পারি। যা আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা, সমাজ সংসারের নানা দুঃখ কষ্ট থেকে একটু হলেও রেহাই দেয়, ফলে আমাদের মানসিক চাপ অনেকটাই কমে যায়।

৪) অন্যের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ:- যিনি বই লেখেন তিনি তাঁর বইয়ের প্রতিটি পাতায় তাঁর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করেন লেখার মাধ্যমে, তাঁর সেই জ্ঞানের আলোয় আমরা আলোকিত হয়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করার সুযোগ পেয়ে থাকি। তুমি কি নেপোলিয়ন হিলের লেখা ”থিন্ক অ্যান্ড গ্রো রিচ” বইটি পড়েছো? বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ২৩৮ জানো কী লেখকের বইটি লিখতে কত সময় লেগেছে? নানা গবেষণা করে বইটি শেষ করতে লেখকের ২০ বছর সময় লেগেছে। একজন মানুষের স্বাভাবিক বইপড়ার গতি যদি ২৫০ wpm হয় তাহলে বইটি পড়ে শেষ করতে ৬ ঘন্টা লাগবে। তাহলে তুমি ভাবো কুড়ি বছরের অভিজ্ঞতা তুমি ৬ ঘন্টায় জানতে পারছ। তাহলে ভেবে দেখো বই পড়া কেন জরুরী? একটি বইতে লেখক তাঁর জীবনের উত্থান ও পতন দুটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। তুমি তাদের গল্প থেকে শিক্ষা নিতে পারো এবং কোন পথে গেলে তুমি সফল হবে তা জানতে পারো। বই নতুনভাবে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে ও মস্তিষ্ককে চিন্তা করতে উপযোগী করে গড়ে তোলে।

”The art of reading is in great part that of acquiring a better understanding of life from ones encounter with it in a book.“

– Andre maurois

৫) কল্পনা শক্তি বৃদ্ধি করে:- যতবেশি বই তুমি পড়বে ততবেশী কল্পনা শক্তি তোমার বৃদ্ধি পাবে। কারন বইয়ের ভেতরে যে জগতের বর্ণনা থাকে আমরা বই পড়ার মধ্যে দিয়ে সেই জগতটির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারি। কখনো কখনো বই আমাদের একটি ছোট্ট ভ্যাকেশনে নিয়ে যায়। কারন পড়ার মাধ্যমে আমরা পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে যেতে পারি। বই-এই ভিতরে থাকা নতুন জগতের নতুন চিত্র, নতুন বর্ণনা নতুন নতুন ভাবে উপলব্ধি করতে পারি। ফলে আমাদের মনন জগতের কল্পনা শক্তি বৃদ্ধি পেতে শুরু করে।

জেনে নাও: জীবন বদলে দেওয়ার মতো ৫-টি বই

৬) স্মরণ শক্তির বৃদ্ধি ঘটে:- আমরা যখন কোনো বই পড়ি তখন বইয়ের ভিতরে থাকা অগনিত তথ্যগুলি মনে রাখতে হয়। যেমন ধরো- কোনো উপন্যাস, তা সেটা প্রেমেরই হোক বা ঐতিহাসিক কিংবা রাজনৈতিক কিংবা গোয়েন্দা সিরিজ অথবা কারো অটোবায়োগ্রাফি তোমাকে কিন্তু সেই উপন্যাস কিংবা গল্পের চরিত্রের নাম, ইতিহাস, স্থান, উপন্যাসের উদ্দেশ্য, প্লট, উপকাহিনি, সবটাই মনে রাখতে হয়। নাহলে পড়ার মজা আসে না। যখন আমরা এইসব তথ্য মনে রাখার কাজ করি তখন আমাদের মস্তিষ্কের অনেক exercise হয় যার ফলে memory power বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও বই আমাদের মস্তিষ্কের নতুন নতুন কানেকশন তৈরি করে, ফলে আমাদের নতুন করে জানার আগ্রহ, মনে রাখার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

৭) শব্দভাণ্ডার বৃদ্ধি:- দেশি বিদেশি বিভিন্ন ভাষার বই পড়লে আমাদের ঝুলিতে নতুন নতুন শব্দের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। লেখক যখন বই লেখেন তিনি অনেক বিষয় নিয়ে গবেষণা করে থাকেন, শব্দ নিয়েও তাঁর গবেষণা কম থাকে না। আর আমরা বইপড়ার মাধ্যমে সেই শব্দগুলি সহজেই শিখে নিতে পারি। ফলে কথা বলার সময় সেই শব্দগুলি ব্যবহার ক’রে আমরা আমাদের বাচনভঙ্গিকে স্পষ্ট, সুন্দর ও তাৎপর্যমন্ডিত করতে পারি। আর যে ব্যক্তি অনেক বই পড়ে থাকেন তিনি খুব সহজেই অন্যের সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। এতে ব্যক্তিজীবন উন্নত হয় এবং আত্মবিশ্বাসও বেড়ে যায়। নতুন ভাষা শিখতেও বই পড়া আবশ্যক।

”A book is like a garden carried in the pocket”

– Chinese proverb

৮) লেখনী শক্তি বৃদ্ধি:- নিয়মিত বই পড়ার ফলে আমাদের ভাবনাকে প্রকাশ করার ক্ষমতা বেড়ে যায়। সুন্দর কথা বলার মতো বেড়ে যায় লেখনীর দক্ষতাও। বিভিন্ন লেখকের লেখার বিভিন্ন শৈলীর সঙ্গে পরিচিতি ঘটার ফলে নিজস্ব লেখনী শক্তিও তার স্বাতন্ত্র্য খুঁজে পায়।

৯) Critical thinking বৃদ্ধি করে:- বই পড়ার আর একটি উপকারিতা হলো এর মাধ্যমে আমাদের critical thinking develop হয়। ধরো তুমি কোন গোয়েন্দা উপন্যাস কিংবা রহস্যজনক গল্প পড়ছো, গল্পটি শেষ করার আগেই তুমি রহস্যের উন্মোচন করতে পারছো। এতে তোমার মস্তিষ্ক আরও তেজী হয়, আর তোমার চিন্তা ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়।

১০) একাগ্রতা বৃদ্ধি করে ও মানসিক প্রশান্তি দান করে:- রোজ নিয়ম করে বই পড়লে বেড়ে যায় একাগ্রতা শক্তি — আধুনিক গবেষণায় এমনটাই উঠে এসেছে। ক্রমাগত ভার্চুয়াল জগতে বিচরণ করার ফলে আমাদের মনোযোগ যেমন কমতে থাকে তেমনি বাড়তে থাকে মাল্টিটাষ্কিং-এর অভ্যাস। যার ফলে আমাদের স্ট্রেস লেভেল বেড়ে যায় আর প্রোডাক্টিভিটি কমে যায়। কিন্তু যখন আমরা কোনো একটি গল্প বই পড়ি তখন আমাদের মনোযোগ সেই বইয়ের ভিতরে থাকা পৃথিবীটার সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে বই পড়ার অভ্যাস আমাদের একাগ্রতা শক্তি বৃদ্ধি করে।

আবার যখন আমরা আমাদের পছন্দের বইগুলি পড়ি তখন আমরা অনেক শান্ত ও প্রশান্তি অনুভব করি। বিশেষ করে আধ্যাত্মিক বই পড়লে আমাদের মনে প্রশান্তি আসে। গবেষণায় দেখা গেছে আধ্যাত্মিক বই পড়লে রক্তচাপ কমে যায় অনেকটাই। আবার আমরা যখন হতাশায় লিপ্ত থাকি তখন একটি self help book আমাদের বাঁচার নতুন রাস্তা দেখায়।

১১) সহানুভূতি বোধ:- বই পড়ার মাধ্যমে তৈরি হয় এক সহানুভূতিপূর্ণ মানসিকতা। ২০১৩ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর বই পড়া নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ফিকশন, ননফিকশন ও সাধারণ কিছু বই পড়তে দেওয়া হয়। ৫-টি পরীক্ষার মধ্যে দেখা যায় যারা কল্প সাহিত্য নিয়ে পড়েছে তারা ভালো ফল করেছে কিছু কাজে, যেমন কীভাবে অভিনয় করবে বা মুখের অভিব্যক্তি কী রকম হবে তা ব্যক্ত করা। এরথেকে বোঝা যায় তাদের মধ্যে অন্যের মানসিক চাপ অনুভব করার ক্ষমতা রয়েছে, যাকে বৈজ্ঞানিকরা বলেন ”Theory of mind”। এখানে প্রমাণিত হয় যে কল্পনা নির্ভর বই পড়ার মাধ্যমে চরিত্রের সঙ্গে সুখ দুঃখ অনুভূতির একাত্মবোধ গড়ে ওঠে। বাস্তব জীবনেও এইসমস্ত মানুষ অনেক বেশি সহানুভূতিপ্রবণ হৃদয়ের হয়ে থাকেন।

১২) আত্মসম্মান বোধ তৈরি করে:- বই পড়ে মানুষ সমাজের কাছে ভালোমন্দ মানবিক গুনগুলির মূল্য বুঝতে শেখে, তাই নিজের এমন একটা আত্মসম্মান বোধ তৈরি হয় যেটা অন্যভাবে এতটা হতে পারে না। নিজের প্রতি সম্মান না জানাতে পারলে অন্যকে সন্মান জানাতে শেখা যায় না।

”Books are the mirrors of the soul.“- Virginia Woolf

১৩) সংলাপ দক্ষতা:- একথা বলাই বাহুল্য যে শব্দভাণ্ডার ও শব্দের সঠিক প্রয়োগ বই পড়ে ভালো শেখা যায়। আর বাস্তব জীবনেও সেগুলোর যথাস্থানে প্রয়োগের মাধ্যমে বা কারো সাথে কথোপকথনে ব্যবহারের ফলে সুন্দর যোগাযোগের দক্ষতা যেমন বাড়ে, তেমনি বাড়তে পারে অপরের কথার সঙ্গে তাল মিলিয়ে যুক্তিসই কথা বলার দক্ষতাও।

১৪) ভালো ঘুমাতে সাহায্য করে:- অনেকেরই সমস্যা শোনা যায় যে, ঘুম আসে না। আবার ঘুমের আগে শোয়ার সময় মোবাইল ফোনে, কিংবা ল্যাপটপে সময় কাটানোর ফলে কমতে থাকে গাঢ় ঘুমের সম্ভাবনাও। তাই গবেষণায় উঠে এসেছে যদি ঘুমানোর আগে একটি ভালো বই পড়া যায় তাহলে মস্তিষ্ককের কোষগুলি শান্তভাবে কল্পনার রাজ্যে বিচরণ করে, ফলে খুব তাড়াতাড়ি ঘুম চলে আসে। আর মস্তিষ্কে প্রশান্তির ফলে গাঢ় ঘুম হবার প্রবণতাও তৈরি হয়। রাত্রে সোশ্যাল মিডিয়ার এডিকশন থেকে বাঁচতে বই পড়া একটি অন্যতম পন্থাও হতে পারে।

“Whenever you read a good book, somewhere in the world a door opens to allow in more light.“- Vera Nazarian

তাহলে এসো বন্ধুরা, আমরা এবার কিছু বই সংগ্রহ করে জীবনের সঙ্গে জুড়ে নিয়ে একটা বড়সড় বদল আনি। ছাত্র ছাত্রীদের এই লেখাটি বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা রচনা, বই পড়া প্রবন্ধ রচনা, বই পড়ার গুরুত্ব রচনা ইত্যাদিতেও সাহায্য করবে বলে আসা রাখি। বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করতে ভুলো না যেন। খুব ভালো থেকো, সুস্থ থেকো।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *